শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
MaasrangaNews

অন্যান্য

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র: ব্যক্তিস্বার্থ নাকি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা?

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র: ব্যক্তিস্বার্থ নাকি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা?

রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ৮০ লাখ মেট্রিক টন কয়লা আমদানির মেগা দরপত্রকে ঘিরে চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (বিআইএফপিসিএল)–এর চিফ প্রকিউরমেন্ট অফিসার (সিপিও) এস এম জাহিদ হাসান নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ সুবিধা দিতে দরপত্রের শর্তাবলী ব্যবহারে দ্বিমুখী নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি দেশের সামগ্রিক জ্বালানি খাতের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

​​শিল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দরপত্র মূল্যায়নের পুরো প্রক্রিয়াটিতে সমান সুযোগ বা 'লেভেল প্লেইং ফিল্ড' নিশ্চিত করা হয়নি। অভিযোগকারীদের দাবি, অংশগ্রহণকারী সব প্রতিষ্ঠানের কারিগরি ও আর্থিক মানদণ্ড একইভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। নিরপেক্ষ মূল্যায়নের বদলে একটি বিশেষ মহলকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা চলায় বাকি দরদাতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।

​অভিযোগ উঠেছে, দরপত্র মূল্যায়নে লিয়্যানেক্স, মোহিত মিনারেলস এবং লোশে শিপিংয়ের মতো কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। অথচ কয়লা সরবরাহের পূর্ব অভিজ্ঞতা, প্রয়োজনীয় কারিগরি ও লজিস্টিক সক্ষমতা এবং দরপত্রের কঠিন শর্ত পূরণের ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের সামর্থ্য নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। অপরদিকে, সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'লিয়্যানেক্স' প্রয়োজনীয় সব কারিগরি নথিপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রস্তাবে জোরপূর্বক ত্রুটি খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।

​কয়লার উৎস সংক্রান্ত ‘মাইন এমওইউ’ (সমঝোতা স্মারক) যাচাই প্রক্রিয়ার দুর্বলতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। দরদাতাদের জমা দেওয়া সমঝোতা স্মারকগুলো শুধুই একটি কাগজ হিসেবে গ্রহণ না করে, সরাসরি কয়লা খনির মালিক বা তাঁদের অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে স্বাধীনভাবে যাচাই করার জোর দাবি উঠেছে। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার যেসব খনি থেকে কয়লা আনার কথা বলা হচ্ছে, সেসব খনির প্রকৃত মালিকানা, প্রতিদিনের উৎপাদন সক্ষমতা, কয়লার মান এবং তা নিয়মিত সরবরাহ করার সামর্থ্য খনি কর্তৃপক্ষের অফিশিয়াল ই-মেইল ও যোগাযোগের মাধ্যমে নিশ্চিত করা জরুরি।

ভুল বা অক্ষম কোনো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে চুক্তি দেওয়া হলে তার মাশুল গুণতে হবে পুরো দেশকে। তারা সময়মতো সঠিক মানের কয়লা যোগান দিতে ব্যর্থ হলে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন পুরোপুরি ব্যাহত হতে পারে। এটি কেবল বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানবে না, বরং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।

এস এম জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে অসৎ উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করার অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী দরদাতারা। তাঁদের অভিযোগ, কোনো এক অদৃশ্য পক্ষকে সুবিধা দিতে অন্য যোগ্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে চক্রান্ত করে প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এই ধরনের আচরণ আন্তর্জাতিক দরপত্রের মৌলিক নীতি, স্বচ্ছতা ও মুক্ত প্রতিযোগিতার ধারণার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

​জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার অভিযোগও সামনে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ছিল। এই সম্পর্ককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি দরপত্রের সিদ্ধান্ত নিজের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ ছাড়া বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী 'এস আলম গ্রুপ'-এর সাথেও তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের তথ্য উঠে এসেছে।

​শুধু দরপত্র জালিয়াতিই নয়, জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তাঁর নিজ জেলা নওগাঁয় নদীর কোল ঘেঁষে একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। যদিও এসব সম্পদ বিবরণী ও মালিকানার নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করার প্রক্রিয়া এখনও চলছে, তবু অভিযোগের তীর তার দিকেই নির্দেশ করছে।

​৮০ লাখ মেট্রিক টন কয়লার এই বিশাল চুক্তি নিয়ে যে সন্দেহ দানা বেঁধেছে, তা দূর করতে দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটির প্রতিটি ধাপ সর্বসাধারণের সামনে স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে। 

প্রতিটি দরদাতার লজিস্টিক, আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা সমানভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা প্রকাশ করা উচিত। অভিযোগগুলোর সতত্যা প্রমাণিত হলে বর্তমান দরপত্র বাতিল করে নতুনভাবে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বানের জোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

​রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই দরপত্রটি কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়, এর সাথে যুক্ত রয়েছে পুরো দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ। কোনো ব্যক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠীর অপপ্রভাবের কাছে দেশের কৌশলগত স্বার্থ বলি দেওয়া যাবে না। তাই কোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যাচাইযোগ্য নথি, প্রমাণিত অভিজ্ঞতা ও শতভাগ স্বচ্ছতাকে প্রাধান্য দিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

আরও

বৈষম্যবিরোধী অঙ্গীকার থেকে ১১ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি

অন্যান্য

বৈষম্যবিরোধী অঙ্গীকার থেকে ১১ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি

বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত হয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তব...

২০২৬-০৯-১৪ ১৭:৪৫

বিপিসির জ্বালানি আমদানিতে একই বলয়ের ছয় সরবরাহকারী

অন্যান্য

বিপিসির জ্বালানি আমদানিতে একই বলয়ের ছয় সরবরাহকারী

সরকার বদলেছে, বদলেছে জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারণের কাঠামোও। কিন্তু বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি আমদ...

২০২৬-০৯-১৪ ১৩:০৩

বিদ্যুতের পুঞ্জীভূত সংকটে শুধু মন্ত্রীকে দোষারোপ কতটা যৌক্তিক?

অন্যান্য

বিদ্যুতের পুঞ্জীভূত সংকটে শুধু মন্ত্রীকে দোষারোপ কতটা যৌক্তিক?

কে না জানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অন্যসব রাজনীতিবিদের মতো কাজে-কর্মে এখন আর গতানুগতিক নন। কে না জানে রাষ্ট্রের শীর্ষ...

২০২৬-০৯-১৩ ১৩:৩০

ড. ইউনূসের গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের নির্দেশ হাইকোর্টের

অন্যান্য

ড. ইউনূসের গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের নির্দেশ হাইকোর্টের

গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করতে হবে বলে রায় দিয়েছেন হাইকো...

২০২৬-০৯-১০ ২৩:৪৩

ক্রেতা-বিক্রেতার সময় ও ঝামেলা কমাতে ‘সুপার সেল কার বাজার’

অন্যান্য

ক্রেতা-বিক্রেতার সময় ও ঝামেলা কমাতে ‘সুপার সেল কার বাজার’

রাজধানীতে গাড়ি বা মোটরসাইকেল কেনার পাশাপাশি নিজের ব্যবহৃত যানবাহন বিক্রি করতে আগ্রহীদের জন্য নতুন একটি মার্কেটপ্লেস হিসে...

২০২৬-০৯-১০ ১৯:০৯

ইউনুস-ফওজুলের ভুল নীতিই বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান লোডশেডিং?

অন্যান্য

ইউনুস-ফওজুলের ভুল নীতিই বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান লোডশেডিং?

বিদ্যুৎ সংকট বর্তমান সরকারকে চরম বিড়ম্বনায় ফেলেছে। এর পেছনে যে কারণটি রয়েছে তা সাধারণের ধারণার বাইরে। অভিজ্ঞরা মনে করছেন...

২০২৬-০৯-১০ ১২:২৬